সাদা কাপড়ি (পর্ব–৬): আয়নাহীন ঘর
✍ সালমান আহমদ ইলিয়াস
(৬)
রাতুল জানালার কাঁচে তাকিয়ে ছিল। সাদা কাপড়ি মিলিয়ে গেলেও তার হাড় কাঁপানো হাসি যেন এখনও বাতাসে বাজছে। হাসান তখনো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, চোখ দুটি নিঃসাড়, অথচ লাল—জ্বলন্ত।
রিপা বলল,
—আমরা আয়নাহীন ঘর খুঁজব কোথায়?
মনীষা ভাবছিল। তারপর হঠাৎ বলল,
—সুন্দরবনের ধ্বংসাবশেষ জমিদারবাড়ির নিচতলায় আমরা গিয়েছিলাম, মনে আছে? নিচের একটা ঘরে আয়না ছিল না।
হাসান কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
—হ্যাঁ… আমি মনে করতে পারছি… ওখানে কিছু আটকে ছিল… হয়তো আমিও…
তারা সিদ্ধান্ত নিল, পরদিন সকালে আবার যাবে সেই ‘মরণবাড়ি’র দিকে।
(পরদিন)
বৃদ্ধ মাঝিকে খুঁজে পাওয়া গেল না। তিনি নৌকা ফেলে কোথায় যেন উধাও। গন্তব্য ঠিক করেই চারজন হেঁটে পৌঁছাল পুরোনো জমিদারবাড়ির সামনে।
বাড়িটা আগের চেয়ে যেন আরও ভয়ানক, ছায়া যেন ঘনিয়ে আছে। গাছের পাতাও নড়ছে না।
ভেতরে ঢুকে সেই আয়নাহীন ঘরে পৌঁছানোর আগেই তারা দেখতে পেল ভাঙা দরজার ওপাশে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে।
রাতুল বলল,
—ওটা… ওটা কি রিপার বাবা?
ছায়াটি ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। না, সে রিপার বাবা নয়।
তার মুখ নেই—শুধু ফাঁকা। শরীর কাপড়ে মোড়া, কিন্তু গায়ে আগুনের আঁচ।
হঠাৎ সে ফিসফিস করে বলল,
—তোমরা কেউ পালাতে পারবে না… সে যার শরীরে ঢুকেছে, সে তাকে বের হতে দেবে না।
হাসান পেছনে হঠাৎ পড়ে গেল। মাটিতে ছড়িয়ে থাকা পাথরে তার হাত কেটে গেল। রক্ত বেরোতেই ভৌতিক ছায়াটি থমকে গেল।
মনীষা বলল,
—ও আয়নার ছায়া দেখে ভয় পায়… কিন্তু রক্তে থামে?
রিপা তখন পকেট থেকে সেই পুরোনো চিঠির বাক্স বের করল। ভাঙা আয়নার টুকরো তুলে সামনে ধরল।
ভৌতিক ছায়া আর্তচিৎকারে ছায়া হয়ে মিলিয়ে গেল।
(ঘরের ভেতর)
তারা সেই আয়নাহীন ঘরে ঢুকল। ভেতরে একটা ছোট টেবিল, পুরোনো কিছু বই, আর একটা লুকানো সুটকেস পাওয়া গেল।
ভেতরে কিছু পুরোনো দলিল—আরেকটি চিঠি।
“আমি তাকে দেখেছিলাম... তার হাতে আগুন ছিল। সে বলেছিল, আমি ফিরব—যখন তার হৃদয় আগুনে পুড়বে। তখন আমি আমার সন্তানকে ফিরিয়ে নেব…”
রাতুল ফিসফিস করে বলল,
—সন্তান? কাদের?
হাসান চুপচাপ বসে পড়ল। চোখ বন্ধ করল।
তখন মনীষা আবিষ্কার করল একটি দলিলে লেখা—“Ripar Baba, the culprit – Pond Accident”
সবাই চমকে উঠল।
রিপা ফিসফিস করল,
—আমার বাবার বাড়ির পেছনে পুকুরে ছোট এক ছেলের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল… অনেক বছর আগে…
মনীষা বলল,
—তার সাথে খুলনার এই ঘটনার সম্পর্ক কী?
রাতুল ধীরে বলল,
— কোন না কোন সম্পর্ক নিশ্চয়ই আছে, একদম কাকতালীয় নয়?
সবাই চুপ।
চোখ বুজে হাসান বলল,
—যে ফিরে আসতে চায়, সে সবকিছু পোড়াতে চায়… কিন্তু আগুন ছড়িয়ে গেলে সবাই পুড়ে যাবে।
---
(শেষ দৃশ্য)
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কিন্তু আয়নাহীন ঘরের ভেতর বাতাস থেমে আছে।
আয়নাতে হঠাৎ এক মুখ ফুটে উঠল—একেবারে অচেনা, না রিপা, না মনীষা, না রাতুল, না হাসান…
কে সে?
চলবে…
সাদা কাপড়ি (পর্ব–৭): ছায়ার নিচে পাপ
✍ সালমান আহমদ ইলিয়াস
(৭)
ঘরের ভেতর আয়নার ফাটলে ফুটে উঠেছিল অচেনা সেই মুখ—চোখ দুটো গভীর, কিন্তু কেমন যেন শূন্য। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি।
মনীষা পিছিয়ে গেল,
—এই মুখটা কার? এটা তো আমাদের কেউ না!
হাসান আস্তে বলল,
—এই মুখটা… আমি স্বপ্নে দেখেছি… অনেকবার।
রাতুল চারপাশে তাকিয়ে দেখল, সেই মুখ আর আয়নাতে নেই। যেন কখনও ছিলই না।
রিপা তখন সেই পুরোনো আরেকটি চিঠি বক্স থেকে হাতে নিয়ে পড়ছিল,
—এখানে লেখা আছে, পুকুরে ডুবে যাওয়া শিশুটির নাম—সালেহ। আর তার বাবার নাম… জামাল উদ্দিন।
সবাই থমকে গেল।
মনীষা ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল,
—জামাল উদ্দিন… মানে ফুপা, ফুপুর স্বামী না?
রিপার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
—মানে… কিছুই তো বুঝতে পারছি না। সালেহের মৃত্যুর সাথে এর সম্পর্ক কী?
হাসান নিচু গলায় বলল,
—তিনি তার ছেলেকে হারিয়েছিলেন… আর ঘটনাস্থল ছিল তোদের বাড়ির পেছনের পুকুর। (রিপা কে উদ্দেশ্য করে) তোর বাবা বলেছিলেন এটা দুর্ঘটনা… কিন্তু তিনি মনে না এটা বিশ্বাস করেছেন।
তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল,
—দুর্ঘটনা বলে চাপা দিলে পাপ মুছে যায় না, সত্য বেরিয়ে আসবেই আসবে।
সবাই ঘুরে তাকাল—দাঁড়িয়ে আছে ফুপুর স্বামী, ফুপা জামাল উদ্দিন।
কিন্তু তার চেহারা বদলে গেছে—চোখের নিচে গাঢ় কালো ছায়া, মুখে যন্ত্রণার রেখা।
রিপা ফিসফিস করে বলল,
—আপনি এতদিন… কোথায় ছিলেন?
জামাল উদ্দিন ধীরে ধীরে বলল,
—এখানেই… সবসময়… এই বাড়িতে… ছায়ার মতো। তোমাদের আনার জন্যই আমি সব সাজিয়েছিলাম… কারণ আমার প্রশ্নের উত্তর দরকার… কে ছিল দায়ী? কে আমার সালেহকে ফেলে গিয়েছিল?
সবাই স্তব্ধ।
---
(অতীতের দ্বার খোলে)
জামাল উদ্দিন এক কাগজ বের করল—একেবারে পুরোনো, ঝাঁপসা কালি। অনেক ধরে জমিয়ে রাখা চিরকুট।
“সেদিন আমি দেখেছিলাম এক কিশোর ছেলেটিকে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে। সে আমার ছেলেকে ভয় দেখাচ্ছিল… আমি ছুটে আসার আগেই সে পানিতে পড়ে গেল। আমি কিছু বলতে পারিনি… আমি চুপ ছিলাম।”
হাসান ফিসফিস করে বলল,
—এই লেখাটা আগে কোথাও হাতের লেখা এই হাতের লেখা দেখেছি, কিন্তু মনে হচ্ছে না…
রিপা এক ধাক্কায় বসে পড়ল,
—মানে… আমার বাবা জানতেন…?
জামাল উদ্দিন বলল,
—রিপা বাবা পরে… বলেছিলেন, এটা একটা দুঃখজনক দুর্ঘটনা। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। আর তখনই থেকে আসল তথ্য জানার চেষ্টা করি… সাদা কাপড়ি আমার মনের কথা জানতো, সাদা কাপড়ি এসেছিল আমার কাছে… বলেছিল, চাইলে আমি ছেলের আত্মাকে ফিরিয়ে দিতে পারি এবং কে মেরেছে বলে দেবে… বিনিময়ে চাই শুধু… একটা দেহ।
---
নতুন শঙ্কা
রাতুল বলল,
—আপনি তাহলে সাদা কাপড়ির সাথে চুক্তি করেছিলেন?
জামাল উদ্দিন বলল,
—না… আমি করিনি। কিন্তু নাও করিনি, বলতে গেলে মৌন সমর্থন ছিলো, আমি সত্যটা জানতে চাইছিলাম।
হঠাৎ জানালার বাইরে ঝড় শুরু হল। আবার সেই ছায়া—সাদা কাপড়ে মোড়ানো, এবার আরও স্পষ্ট।
হাসান চিৎকার করল,
—সে ফিরেছে! এবার সে কাউকে ছাড়বে না!
মনীষা বলল,
—আমাদের কিছু করতে হবে… চুক্তির ছায়া কাটাতে হবে। কিন্তু কীভাবে?
রিপা বলল,
—চিঠিতে বলা হয়েছিল—যার ছায়া আয়নায় ধরা পড়ে, সে দুর্বল হয়।
তখন রাতুল বলল,
—তবে আমাদের দরকার সেই আয়না… আর সাহস।
---
(শেষ দৃশ্য)
আয়না নিয়ে চারজন দাঁড়ায় সাদা কাপড়ির মুখোমুখি।
হঠাৎ আয়নায় ঝলকে ওঠে তিনটি মুখ—একটা হাসানের, একটা জামাল উদ্দিনের… আর একটা, একেবারে অপরিচিত… এক কিশোর ছেলের… সালেহ?
চলবে…
সাদা কাপড়ি (পর্ব–৮): আয়নার ওপারে
✍ সালমান আহমদ ইলিয়াস
(৮)
ঝড়ের মধ্যে আয়নার ঝলকে ফুটে উঠল তিনটি মুখ—হাসান, জামাল উদ্দিন, আর এক কিশোর ছেলেটি… সালেহ!
মনীষা চিৎকার করে উঠল,
—ওটা তো সালেহ! সেও তো ফিরতে চায়!
হাসান কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—ও আমার ভেতরেই ছিল… দিনের পর দিন… সে ঘুমায়নি, শুধু দেখেছে… আর আমাকে দেখিয়েছে। এই ভাবে পাগলের মতো হাসান কথা বলতেছে।
রিপা বলল,
— হাসান শান্ত হও, কিছুই হয়নি। আমরা সবাই ঠিক আছি।
তখনই জানালার কাচ ভেঙে সাদা কাপড়ি ঢুকে পড়ল ঘরে—এবার সে আর ছায়া নয়, পুরো শরীর। চোখদুটো অন্ধকার, অথচ অদ্ভুতভাবে দগদগে।
সবার শরীর জমে গেল। রাতুল ঠোঁট শুকনো গলায় বলল,
—আমরা… কী করব এখন?
(চুক্তির ছায়া)
সাদা কাপড়ি ধীরে ধীরে হাসানের দিকে এগিয়ে যায়। তার ঠোঁট না নড়লেও সবার মনে ভেসে আসে আওয়াজ—
"সে আমায় ডাকেছিল… প্রতিশোধ চেয়েছিল… আর আমি এসেছিলাম… বিনিময়ে শরীর চেয়েছিলাম… আমি পেয়েছি। এখন কেউ ফিরতে চায়… কেউ যেতে চায় না…"
জামাল উদ্দিন সামনে এসে দাঁড়াল,
—তুমি আমার সালেহকে দাও…আমার ছেলের মৃত্যুর আসল ঘটনা বলো?
সাদা কাপড়ি থেমে গেল। এবার বলল,
—তুমি কথা রাখনি… তুমি চুক্তি ভেঙেছো। এখন আমিই ঠিক করব—কে যাবে, কে থাকবে।
রিপা চোখ বুঁজে আয়নার দিকে তাকাল। আয়নায় তখন শুধু একটাই মুখ—হাসানের… কিন্তু তার মুখের অর্ধেকটা যেন আর তার নয়… সেখানে সালেহ।
(রহস্য উদ্ঘাটন)
হঠাৎ (জালাল উদ্দিনের) বাড়ির এক কাজের লোক প্রবেশ করল, হাতে আরেকটি চিঠি।
—এইটা আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম… দয়া করে পড়ে নিন।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“সালেহ পুকুরে পড়ে যায়নি। তাকে ঠেলেছে এক ছেলে… নাম হাসান। আমার ছেলে সব দেখেছিল… সে বলেছিল, কিন্তু আমি বলিনি… আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
সবাই চুপ।
হাসান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল,
—আমি? আমি তো…
রাতুল বলল,
—তুই তখন ছোট ছিলি… কিন্তু এতদিন ধরে এই গিল্টি মনেই তো সাদা কাপড়ি ঢুকেছে… তোর ভেতরেই ওর ঠাঁই হয়েছে।
(মুক্তির শুরু)
মনীষা আয়নাটা হাসানের সামনে ধরল।
হঠাৎ আয়নায় দগদগে আগুন দেখা গেল—আর সাদা কাপড়ি আর্তনাদ করে চিৎকার করল।
“ও তোর নয়… আমার ছিল… প্রতিশ্রুতি ভাঙা হয়েছে!”
আয়নার ভেতর থেকে সালেহের ছায়া ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে গেল, সে একবার বাবা জামাল উদ্দিনের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলল… আর বলল, —বাবা, এবার যেতে দাও।
জামাল উদ্দিন ছুটে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে চাইল, কিন্তু সে মিলিয়ে গেল হাওয়ায়…
সাদা কাপড়ি ছিঁড়ে-ছিঁড়ে ছাই হয়ে গেল। ঘরে আগুনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল… আর সব নীরব।
---
(শেষ দৃশ্য)
রাত পেরিয়ে ভোর। হাসান শান্ত, ঘুমোচ্ছে। তার পিঠে আগুনের চিহ্ন মুছে গেছে।
জামাল উদ্দিন একপাশে দাঁড়িয়ে,
অপলক দৃষ্টিতে ঐ প্রান্তের দিকে তাকিয়ে আছে!!!
মনিষা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
—সাদা কাপড়ির গল্প শেষ হলো?
জালাল উদ্দিন নিচু গলায় বললেন,
—গল্প শেষ নয়… শুধু প্রথম অধ্যায় শেষ… কারণ রিপার বাবাকে লুকানো আমার পরিকল্পনায় থাকলেও আমি লুকাইনি, জানি সে কোথায়, তাছাড়া আমার ছেলে বড় ছেলে শাহীন আমাদের রসু চাচা (বাড়ির পুরনো কাজের লোক) কোথায় জানি না!
চলবে…
সাদা কাপড়ি (পর্ব–৯): সবুজ বাতি ঘর
✍ সালমান আহমদ ইলিয়াস
(৯)
সকালবেলা, সূর্যের আলো পুরোনো বাড়ির দেয়ালে পড়ে ধীরে ধীরে গা ছমছমে আবহটা সরিয়ে নিচ্ছিল—তবু সবার মনে ভয় জমে ছিল আগের রাতের মতোই।
রাতুল, মনীষা, রিপা এবং হাসান এক জায়গায় বসে চুপচাপ। হাসান অনেকক্ষণ পরে একটু হেসে বলল,
—আমি ঠিক আছি। এখন… অন্তত কিছুক্ষণের জন্য।
তার চোখে তখন আগুনের ঝলক নেই। কিন্তু শরীরটা যেন কাঁপছে ভেতর থেকে। মনীষা তার হাত ছুঁয়ে বুঝল—তাপটা কমেনি।
তখনই হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
সাবধানে দরজা খুলতেই সবাই চমকে উঠল—দাঁড়িয়ে আছেন ফুপুর স্বামী, জালাল উদ্দিন।
দাড়ি-গোঁফ এলোমেলো, চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মুখে একধরনের অদ্ভুত প্রশান্তি।
—আমি ফিরে এসেছি। অনেক কিছু জানার আছে, বলারও আছে। কিন্তু তার আগে… আমাকে বিশ্বাস করতে হবে।
গতরাতের ঘটনায় রিপারা জালাল উদ্দিনের উপর ভরসা প্রায় হারিয়ে ফেলেছে।
রিপা কান্না জড়ানো গলায় বলল,
—আমার বাবা কোথায়? কীভাবে খোজে পাবো?
জালাল উদ্দিন বললেন,
— বিচলিত হলে হবে না, তাদের বের করতে হবে। কোন কোন উপায় অবশ্যই আছে। সেটা খুব দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে।
তারপর তিনি সবাইকে নিয়ে বসলেন পুরনো বসার ঘরে। একটা মানচিত্র বের করে রাখলেন সামনে।
—এই বাড়িতে একটা ঘর আছে, সবুজ বাতি ঘর। সেখানে প্রবেশ করলেই আত্মার শক্তি দুর্বল হয়। আগুনের দাগও নিস্তেজ হয়। ওখানেই নিয়ে যেতে হবে হাসানকে।
রাতুল বলল,
—কিন্তু সেই ঘর কোথায়?
জালাল উদ্দিন বললেন,
—এই মানচিত্র অনুযায়ী, নিচতলার মাটির নিচে একটা লুকানো ঘর আছে। অনেক পুরোনো। কেউ ওখানে যায় না।
তারা সবাই মিলে খুঁজে খুঁজে একসময় আবিষ্কার করল সেই দরজা—ভাঙাচোরা কাঠের খোপের নিচে চাপা।
হাসান চুপচাপ, তার মুখে চাপা আতঙ্ক।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তারা অনুভব করল, ঘরের ভেতরে বাতাস ঠান্ডা। দেয়ালে সবুজের ছায়া নেই। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা মাটির চৌকি।
হঠাৎ হাসান বলে উঠল,
—এই ঘর… এই ঘরে আমি আগে এসেছি। স্বপ্নে।
জালাল উদ্দিন বললেন,
—এটাই আত্মাকে কাবু করার জায়গা। কিন্তু এখন দরকার আরও কিছু—যা তাকে বাইরে বের করে আনবে।
মনীষা বলল,
—কী দরকার?
তিনি বললেন,
—একটা মুখ… যে আয়নায় ধরা পড়ে, কিন্তু বাস্তবে নেই। যাকে কেউ চেনে না।
এই রহস্যময় কথায় সবাই থমকে যায়।
হাসান তখন আয়নার এক টুকরো কাচ তুলে ধরল। আর সেই আয়নায় এক মুখ দেখা গেল—কিন্তু সেটা হাসানের নয়।
রিপা ভয় পেয়ে চিৎকার করল,
—এটা কার মুখ? এটা তো…
তখন জালাল উদ্দিন ধীরে বলে উঠলেন,
—এটাই আমাদের শত্রু, সাদা কাপড়ি ঐ মহিলা। এখন সময় তাকে নামিয়ে আনার।
হঠাৎ হাসান কাঁপতে শুরু করল, তার পিঠের আগুনের দাগ চুলকাতে চুলকাতে বলল,
—সে ফিরে আসছে! সময় খুব কম…
চলবে…
সাদা কাপড়ি (পর্ব–১০): বিপদের মুখোমুখি
✍ সালমান আহমদ ইলিয়াস
(১০)
রাতের নিস্তব্ধতায় সবাই মলাটির সামনে জড়ো। জালাল উদ্দিন, অর্থাৎ ফুপা, মুখ ঝিমিয়ে বললেন,
—আমি সবই সাজিয়েছিলাম প্রতিশোধ নিতে। আমার ছেলের মরণের জন্য রিপার বাবা দায়ী এইটা ভেবে। তাই পরিকল্পনা করে এই রহস্য তৈরি করেছিলাম, সবাইকে ভয় দেখিয়ে তাদের ভেতরের দোষারোপ বের করানোর জন্য।
মনীষা অবাক হয়ে বলল,
— এর জন্য তো বিকল্প উপায় ছিল ফুপা?
জালাল উদ্দিন বললেন
—ছিল, তবে আমি কখনো ভাবিনি এই সাদা কাপড়ির আত্মা সত্যিই এতোটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে, এবং আমাদেরই বিপদ ডেকে আনবে, —( জালাল উদ্দিন করুণ স্বর) ।
—সাদা কাপড়ি... সে আমাদের ধোঁকা দিয়েছে, আমাকে ধোঁকা দিয়েছে, আমাদের সবার জীবন এখন সংকটাপন্ন।
রাতুল কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—তাহলে কি আমরা এভাবে ধুকবো? কিছু করব না?
হাসান দৃঢ়ভাবে বলল,
—এখন ভয় পেও না। আমরা মিলে বিপদের মোকাবেলা করব, সাদা কাপড়ির ছলনাকে ধ্বংস করব।
জালাল উদ্দিন চোখ মেলে বলল,
—তোমরা আমার পাশে থাকো, আমি তোমাদের সঙ্গে সব সর্বদা আছি। কিন্তু সাবধান, আসল বিপদ এখনো আসেনি।
মনিষা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
—এবার আরও কঠিন কিছুর মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে।
সবাই একসঙ্গে বলল,
—আমরা প্রস্তুত।
---
চলবে…
