সাদা কাপড়ি
(পর্ব-১) : দাদির গল্প
সালমান আহমদ ইলিয়াস
(১)
সায়িদা খালার পাশের বাড়ির মনীষা, রিপা, রাতুলের সাথে হাসানও রাতে পড়ে। ওরা চার জন প্রথম শ্রেণি থেকেই এক সাথে পড়তেছে। এখন সবাই পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। রাতে পড়া শেষে রাতুলের দাদি আধাঘণ্টা পরিমাণ সময় গল্প বলেন। এই কয়েক দিন ধরে ভৌতিক একটি গল্প বলতেছেন।
গল্পটা শুনতে শুনতে হাসানের মনে হচ্ছে যেন এইটা বাস্তবই। গল্পের আজকের অংশটা শুনে গা শিউরে উঠছে। সবাই ঘরের মধ্যে যেন ভুত দেখতে পাচ্ছে। গল্প বলার মাঝেই বিদ্যুৎ চলে যায়। মনীষা, রিপা, রাতুল ও হাসান অন্ধকারে বসে আছে। হঠাৎ তারা দেখে আবছা আবছা আলোর মধ্যে কে যেন তাদের কাছে আসছে।
সবাই ভুত ভুত বলে চিৎকার করতে শুরু করলো। রাতুলের বাবা টর্চ জ্বালিয়ে ওদের ধমক দিয়ে বললেন ভুত কোথায়?
-- রাতুল: এই তো বাবা এদিকে আসছিলো।
-- হাসান: জি আঙ্কেল এই দিকেই দেখছি।
আবারও ধমক দিয়ে রাতুলের বাবা বললেন তোরা থামবি! কিসের ভূত? কিসের কী? আমিই আসছিলাম। ইতোমধ্যে বাড়ির সবাই দৌড়ে এসেছে। "তুই টর্চ জ্বালিয়ে আসলে তো আর এরা ভয় পেতো না" বললেন রাতুলের দাদি।
রাতুলের বাবা বললেন এখন দোষ সব আমার তাই না? দেখো মা তোমাকে আগেও বলেছি এদের কে ভুত টুতের গল্প বলবানা। তারপরও বলতেছো। ওরা ছোট মানুষ, ভয় তো পাবেই। মনীষার বাবা বললেন দেখো মা তুমি যা ইচ্ছা তাই করো, কিন্তু আমাদের সন্তানদের এসব আউল-ফাউল কিচ্ছা বলো না।
থামবি তোরা বাচ্চাদের বলবো না তো কী বুড়োদের বলবো। তোদের কী মনে নেই তোরা ছোট থাকতে এসব শুনার জন্য কত পাগল ছিলি? তাছাড়া তোরা ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকিস। তোদের বউরা আরও হাইফাই। কেউ কী আমাকে সময় দিছ। এদের সাথেই গল্প গুজব করেই তো আমার দিন কাটাতে হয় বললেন রাতুলের দাদি।
রিপার বাবা বললেন মা তুমি এদের কথায় কান দিও না। তুমি যা ইচ্ছা তাদের সাথে গল্প করো। রাতুলের বাবা রাগ নিয়ে বললেন দেখো ভাই তুমি সব সময় মা কে লায় দিচ্ছো। পরে দেখবে এর পরিণাম কী হয়? যদি বাচ্চাদের কিছু হয় সব দায় কিন্তু তোমার।
রিপার বাবা বললেন আমাকে বেশি শিখাতে আছিস না। আমি জানি কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ। তোর কী মনে নেই মা-দাদি আমার এরকম কত গল্প বলতো। তাতে কী আমাদের কোন ক্ষতি হয়েছে। বরং এর মাধ্যমে জ্ঞানের পরিধি বাড়ে। জিন কী নেই, অবশ্যই আছে। ছোটদের কি এসব জানা প্রয়োজন না। এর মাধ্যমে এরা জানবে, বুঝবে, ভয় পাবে সবই হবে। এই বলতে না বলতে বিদ্যুৎ চলে এলো এবং সবাই সবার ঘরে দিকে চলে গেল।
রাত প্রায় নয়টা, আজকের মতো পড়া শেষ করে সবাই নিজ ঘরে চলে গেলো। হাসান পড়েছে চিন্তায় , আজ খালা আসেনি। একা যেতে হবে। চারিদিকে বিদ্যুতের আলো এরপরও ভয়। ভয়ে ভয়ে এগিয়ে চললো বাড়ির দিকে। একেবারে বাড়ির রাস্তায় ঢুকে যাবে এমন সময় আবারও বিদ্যুৎ চলে গেল, সে শুনতে পেলো তার পেছনে কারো পায়ের শব্দ শুনা যাচ্ছে। পেছন ঘুরে দেখে কেউ নেই। গাঢ় অন্ধকার, তাই কেউ থাকলেও ঠাহর করতে পারছে না। আবার সামনের দিকে হাটতে লাগলো। কিন্তু এবার পেছনের শব্দ আরও জোরে কানে আসছে। পেছন ফিরেই তাকিয়ে কিছু বলার আগেই অজ্ঞান হয় গেলো।
যখন জ্ঞান ফিরলো নিজেকে দেখতে পেলো বিছানায়। পাশে আছে খালা (সায়িদা) ও খালু রাইসুল।
-- হাসান : আমার কী হয়েছিল খালা?
-- সায়িদা: রাস্তায় অজ্ঞান হয় গিয়েছিলি। তোর খালু এখানে এনেছে।
-- রাইসুল: কী হয়েছিল বাবা?
-- হাসান : খালু আমি ভুত দেখেই ভয়ে পেয়ে ছিলাম। এরপর জানি না কী হলো, এখন দেখি এখানে।
-- রাইসুল: হায় রে বাবা, এটা ভূত না আমি ছিলাম।
-- সায়িদা: এ জন্যই বলছিলাম এই বাড়ি না যেতে। বুইড়া বেটি কী যেন আজগুবি কিচ্ছা বলে বাচ্চাদের ভয় পাইয়ে দেয়।
বার্ষিক পরীক্ষা শেষে মনীষা, রিপা, রাতুলরা তাদের ফুপুর বাড়ি খুলনায় বেড়াতে যাচ্ছে। সুন্দরবনসহ নানা জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখবে। হাসানও তাদের সাথে আছে। সায়িদা দিতে রাজি ছিল না। রিপার বাবার পিড়াপীড়িতে রাজি হলো। মনীষা, রিপা, রাতুল , হাসান আর রিপার বাবা পাঁচজন গেলেন খুলনা। রিপার বাবা সাথে থাকায় তারা খুব খুশি হলো। তিনি তার মায়ের মতোই মিশুক প্রকৃতির লোক। কিন্তু সেখানে গিয়ে এমন ঘটনার সাক্ষী হবে কেউ কখনো ভাবেনি।
চলবে..
পরবর্তী পর্ব পড়ুন
সাদা কাপড়ি (পর্ব-২): অজানা ছায়া
✍ সালমান আহমদ ইলিয়াস
খুলনায় পৌঁছানোর পর সবাই বেশ উৎফুল্ল। মনীষা, রিপা, রাতুল আর হাসান চারজনই ঘুরতে বের হলো রিপার বাবার সাথে। প্রথম দিন শহরের আশপাশের কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখে সন্ধ্যায় ফুপুর পুরনো বাড়িতে ফিরে এলো তারা।
বাড়িটি এক সময়কার জমিদার বাড়ি, এখন কিছুটা জরাজীর্ণ হলেও রহস্যময় এক গাম্ভীর্য বয়ে বেড়াচ্ছে। লাল ইটের দেয়াল, উঁচু উঁচু জানালা, খোলা উঠোন আর চারপাশে ঘন ছায়া ফেলা বড় বড় গাছ। সন্ধ্যা নামতেই যেন চারদিক কেমন থমথমে হয়ে ওঠে। বাতাসে একরকম গন্ধ, যেটা শহরের বাতাসে নেই।
রাতুল মজা করে বলল,
—এই বাড়িতে ভূত থাকলে কেমন হতো বলো তো?
—তোমাদের ভূতের গল্পের নেশা তো গেল না!—হেসে বললেন রিপার বাবা।
রাতের খাবারের পর উঠোনের পাশে বারান্দায় সবাই বসে গল্প করছিল। এমন সময় হাসান হঠাৎ একদৃষ্টে তাকিয়ে বলে উঠল,
—ওই দেখো... ওই গাছটার আড়ালে... কেউ দাঁড়িয়ে আছে!
সবাই তার চোখের দিকে তাকাল, কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না।
—তুমি কিছু দেখলে?—রিপা জিজ্ঞেস করল।
—সাদা কাপড় পরা একজন মহিলা। না, আমার মনে হয় ওটা মানুষ না...—হাসানের গলা কাঁপছে।
—আবার শুরু করলি ভূতের গল্প!—বলল মনীষা।
তবে হাসান শপথ করে বলল সে স্পষ্ট দেখেছে। সেই রাতেই সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে—এক বৃদ্ধা সাদা কাপড় পরে তার দিকে এগিয়ে আসছে, মুখ ঢাকা, শুধু হাত বাড়িয়ে বলছে,
—ফিরে যা... ফিরে যা...
পরদিন তারা সুন্দরবনের দিকে রওনা হলো। উদ্দেশ্য একটি পুরনো জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখা। স্থানীয় মাঝি ও গাইডসহ তারা একটি নৌকায় করে নির্জন এলাকায় পৌঁছে যায়। জায়গাটি গাছপালায় ঘেরা, চারদিকে নিস্তব্ধতা। গাইড সতর্ক করলো,
—এই বাড়ির নাম ‘মরণবাড়ি’। লোকেরা বলে এখানে এক জাদুকরী বুড়িকে একদা জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।
বাড়িতে ঢুকতেই বাতাস ভারী হয়ে আসে। ভেতরে ধ্বংসাবশেষ, দেওয়ালে ফাটল, আর এক কোণায় সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটি অদ্ভুত আকৃতি—যেন মূর্তি, আবার যেন মানুষ। হঠাৎ মেঘে আকাশ ঢেকে গেল, বিদ্যুৎ চমকালো। আর ঠিক তখনই সেই সাদা কাপড় যেন নাড়াচাড়া করে উঠলো!
রিপা কেঁপে উঠল, আর মুহূর্তে সবাই দৌড়ে পালাতে লাগল। হাসান পেছনে তাকিয়ে চিৎকার করল,
—ওইটাই তো... ওইটাই সেই সাদা কাপড়ি!
তারা কোনো রকমে গাইডের সহায়তায় নৌকায় ফিরে আসে। কিন্তু হাসান অনেকটা চুপচাপ হয়ে যায়। তার চোখ যেন ভয়ে হতবাক, আর সে একাই বলছিল,
—ওটা আমাদের পেছনে এসেছে… আমি নিশ্চিত!
রিপার বাবা গম্ভীর মুখে বললেন,
—আজ রাতের মধ্যে কিছু হলে অবাক হইও না...
রাত নেমে এলো। বাড়ির চারপাশ নিস্তব্ধ। আর তখনই শুরু হলো অদ্ভুত স্বপ্ন, অদ্ভুত কান্নার শব্দ আর...
চলবে…
সাদা কাপড়ি (পর্ব-৩): নিশুতি রাত
✍ সালমান আহমদ ইলিয়াস
সেই দিন সন্ধ্যায় সবাই ফিরল ফুপুর বাড়িতে। দিনের ঘটনায় সবাই বেশ ক্লান্ত, কিন্তু হাসান চুপচাপ। তার চোখে একটা ভয়ের ছায়া।
রিপা জিজ্ঞেস করল,
—তুই ঠিক আছিস?
হাসান কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
—আমার মনে হচ্ছে… ওটা এখনও আমাদের সাথে আছে।
রাতে খাওয়া শেষে সবাই যার যার বিছানায় চলে গেল। ফুপুর বাড়ির বাতাসও কেমন যেন ভারী লাগছিল। চারদিকে যেন নিস্তব্ধতা চেপে বসেছে।
রাত একটা পেরোলে হঠাৎ মনীষা চমকে উঠল। সে দেখল, হাসান বিছানা ছেড়ে উঠে গেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে। চোখ খোলা, কিন্তু হাঁটার ভঙ্গি অস্বাভাবিক—ঠিক যেন কেউ তাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে।
মনীষা, রিপা, রাতুল—তিনজনই চুপিচুপি অনুসরণ করল। তারা দেখল, বাড়ির পেছনের সেই পুরনো বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে হাসান। তার সামনে পড়ে আছে ছেঁড়া সাদা কাপড়! চারদিক নিস্তব্ধ, কিন্তু বাতাস যেন হাহাকার করে উঠছে।
এমন সময় কোথা থেকে যেন এক বৃদ্ধের গলা শোনা গেল,
—ওটা জেগে উঠেছে... ওরা যে ঘুমোয়, তেমন না...
তারা চারপাশে তাকিয়ে দেখতে পেল, এক বয়স্ক মাঝি ধরণের লোক লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে। তিনি বললেন,
—তোমরা যা দেখেছ, তা শুধু শুরু। ওর নাম ‘সাদা কাপড়ি’। বহু বছর আগে এই এলাকায় এক বুড়ি ওঝাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল—লোকেরা বলত সে নাকি "আত্মা বাঁধতে পারত"।
—তারপর?—কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল রাতুল।
—তার আত্মা নাকি এখানেই আটকে আছে। সাদা কাপড় পরে সে নাকি খোঁজে নতুন দেহ—যাতে আবার ফিরে আসতে পারে। সে সবার স্বপ্নে আসে, ডাকতে থাকে... কারও না কারও ওপর তার চোখ পড়ে। এবার সে বেছে নিয়েছে তোমাদের কাউকে।
এই বলে তিনি বটগাছের নিচে বসে পড়লেন।
—এই গাছটা ওর দরজা। এখানেই আত্মা প্রবেশ করে। ওর ছায়া দেখতে পেলে পালাবে না, বরং শক্ত হও। যত পালাবে, ও তত কাছে আসবে।
হঠাৎ হাসান মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। সবাই দৌড়ে গেল। বৃদ্ধ বলল,
—ভয় পেও না। ও এখন ঘুমের ভেতর বন্দি। তবে সকাল হবার আগেই কিছু একটা করতে হবে।
রাত গভীর হচ্ছিল। চারপাশে যেন আরও কিছুর উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছিল। কেউ জানে না, ঠিক কীভাবে ‘সাদা কাপড়ি’র হাত থেকে মুক্তি মিলবে।
তবে একটা জিনিস নিশ্চিত—এই আত্মা শুধু গল্প নয়। এবার সে সত্যি এসেছে।
চলবে…
সাদা কাপড়ি (পর্ব-৪): কবরের নিচে কী?
✍ সালমান আহমদ ইলিয়াস
ভোর হওয়ার আগেই বৃদ্ধ মাঝি সবাইকে নিয়ে রওনা দিলো গ্রামের প্রাচীন কবরস্থানের দিকে। পথটা সরু, দুপাশে জংলা ঝোপ, মাঝে মাঝে দূর থেকে শিয়ালের ডাক শোনা যায়। হাসান যেন আধা ঘুম-আধা জাগরণ অবস্থায় হাঁটছে, চোখে একটা ফাঁকা দৃষ্টি।
—তাড়াতাড়ি চল,—বৃদ্ধ বললেন,—সূর্য ওঠার আগেই কাজ শেষ করতে হবে।
—কিন্তু আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের?—জিজ্ঞেস করল মনীষা।
—যেখানে ওকে প্রথম বেঁধেছিল, সেই কবরের কাছে। সাদা কাপড়ি’র আসল ঠিকানা ওই কবরখানার শেষ মাথায়। যদি আজকেই কিছু না করি, কাল সকালটা তোমরা দেখতে পারবে না।
কবরস্থানে পৌঁছে বৃদ্ধ একটি পুরনো, ভাঙাচোরা কবর দেখিয়ে বললেন,
—এইখানেই ওর শরীরটা পুড়িয়েছিল লোকে। কিন্তু আত্মা পুড়লো না—বেঁচে থাকলো এই গাছের শিকড়ে বাঁধা। দেখো গাছটা!
সবাই তাকিয়ে দেখলো, এক বিরাট নিমগাছ কবরের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু গাছটা অন্য রকম—তাতে ঝুলছে কিছু সাদা কাপড়ের টুকরো, যেন কেউ ইচ্ছা করে বেঁধে রেখেছে।
হাসানের দম নিতে কষ্ট হচ্ছিল। হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠলো—
—সে এসেছে! সে এসেছে!
হাসানের মুখ কুয়াশার মতো সাদা হয়ে গেল, চোখ উল্টে গেল মাথার দিকে। তার গলা থেকে ভেসে এলো এক নারীকণ্ঠ,
—তোমরা কবর খুঁড়েছো কেন? আমি ঘুমোচ্ছিলাম... এখন আমাকে উঠতে দিলে, ফিরে যাবো না!
সবাই পেছনে সরে গেল, শুধু বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে রইলেন গাছের সামনে। তিনি কাঁপা গলায় কিছু মন্ত্র পড়তে লাগলেন। হঠাৎ হাওয়া উঠে চারপাশে ধুলো উড়তে লাগল, সেই সাথে গাছের ডাল নড়ে উঠল, কাপড়গুলো যেন ফেঁসে গেল বাতাসে!
রিপা আর রাতুল চিৎকার করে উঠলো। তারা দেখতে পেল, মাটির নিচ থেকে হাতের মতো কিছু একটার নড়াচড়া!
—ও ঘুম থেকে উঠছে!—চেঁচাল বৃদ্ধ।
—তোমরা সবাই পেছনে যাও! ওর চোখে কেউ তাকাবে না! যেই তাকাবে, ওর ভেতরে হারিয়ে যাবে!
হাসান মাটিতে কাঁপতে লাগল, মুখে ফেনা উঠছে।
বৃদ্ধ শেষ মন্ত্রটি পড়ার সাথে সাথেই বাতাস থেমে গেল, নিস্তব্ধতা যেন এক মুহূর্তে সব গিলে ফেলল।
তারপর… ধীরে ধীরে মাটি থামলো, গাছটা কেঁপে উঠল, আর সাদা কাপড়গুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
হাসান জ্ঞান হারাল।
সবাই দৌড়ে গেল তার দিকে। বৃদ্ধ বললেন,
—আজ ওকে বাঁচানো গেল, তবে সাদা কাপড়ি এখনও বেঁচে আছে। সে হেরে যায়নি—শুধু পেছনে সরে গেছে।
রাত শেষে সূর্য উঠল, কিন্তু হাসানের বুকের ডান পাশে একটি পোড়া দাগ দেখা গেল—কোনও চিহ্নের মতো।
তারা জানত না, ওই দাগের মানে কী।
তবে এটা নিশ্চিত—এটা শেষ নয়।
চলবে…
---
সাদা কাপড়ি (পর্ব–৫): আগুনের চোখ
✍ সালমান আহমদ ইলিয়াস
কবরস্থানের ঘটনার পর হাসান একেবারে বদলে গেছে। সে আর আগের মতো হাসে না, খায় না, শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো—তার শরীরে পিঠজুড়ে এক পোড়া দাগ, যেন আগুনে লেখা কোনও প্রতীক। গায়ে হাত রাখলেই মনে হয়, শরীরটা জ্বলছে।
এক রাতে মনীষা সাহস করে বলল,
—তোর গায়ে এত গরম কেন হাসান? তুই কাঁপছিস না, কিন্তু আমরাই ঘামে ভিজে যাচ্ছি!
হাসান ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তার চোখ লাল—জ্বলন্ত। হঠাৎ ফিসফিস করে বলল,
—আমি আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি… তুমি দেখছো না?
সে রাতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল—রিপার বাবা হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলেন।
সকালে উঠেই সবাই খেয়াল করল, তাঁর বিছানায় কেউ নেই। দরজা খোলা ছিল, জুতা সেভাবেই রাখা, ফোনও ঘরেই। কিন্তু তিনি নেই। ফুপুর পরিবার কিছু বলতেও পারল না—কারণ তারা নিজেরাও ছিল ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত ভাবে চুপ, যেন কেউ ঘুমের ওষুধ দিয়েছে।
তদন্তে বের হলো—ফুপুর স্বামী, ছেলে, এমনকি বাড়ির পুরনো কাজের লোকও অদ্ভুতভাবে নিখোঁজ! কারো কোনো চিহ্ন নেই, অথচ ঘরের তালা ভাঙা না, দরজা বন্ধ!
রাতুল ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—রিপার বাবাকে শেষবার রাতে হাসানের পাশে বসে কিছু একটা বলতে দেখেছিলাম… তারপর আর দেখিনি।
তখন রিপার ব্যাগে হঠাৎ একটা কাঠের বাক্স পাওয়া গেল—একদম পুরোনো, ধূলিধূসরিত। মনীষা বলল,
—এটা কি রিপার বাবার?
বাক্স খুলে তারা পেল পুরোনো এক চিঠি, পুড়ে যাওয়া তুলসীপাতা আর ভাঙা আয়নার টুকরো। চিঠিতে লেখা:
> “যাকে সে ছুঁবে, তার দেহ হবে তার আশ্রয়। আগুন হবে চিহ্ন। তবে যদি কেউ নিজেকে দেবে—স্বেচ্ছায়—তবে সে আর ফিরবে না। তার বিনিময়ে অন্যরা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু মনে রাখিস, তার ছায়া যখন আয়নায় ধরা পড়বে, তখনই সে দুর্বল হবে।”
মনীষা ফিসফিস করে বলল,
—তাহলে রিপার বাবা… নিজেই নিজেকে দিলেন? আমাদের বাঁচাতে?
রাত নামল। সেই রাতেই হাসান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, চোখে আগুন। সে বলল,
—তুমি ফিরেছো… কিন্তু আমি একা নই এখন। সে এখন আমার ভেতরেই আছে…
জানালার কাঁচে সাদা কাপড়ে মোড়ানো ছায়া—একদম কাছ থেকে তাকিয়ে হাসছিল। হঠাৎ সে মিলিয়ে গেল।
রাতুল জোরে চিৎকার করল,
—আমরা তাকে ফিরিয়ে আনতেই হবে! রিপার বাবাকে, ফুপুর পরিবারকে!
তখন পেছন থেকে হাসান বলল,
—তোমরা ফিরাতে পারো… যদি আয়নাহীন ঘর খুঁজে পাও… আর সময় খুব কম।
চলবে…
---
পরবর্তী পর্বে আভাস:
আয়নাহীন ঘর খুঁজতে গিয়ে অতীতের সাদা কাপড়ির ইতিহাস প্রকাশ
হাসানের দেহে রিপার বাবার আত্মার ইঙ্গিত?
আর আয়নায় হঠাৎ এক মুখ দেখা যায়—যেটা কারো না!
